
ছাত্ররাজনীতির বামপন্থি পরিসর থেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদনের নেতৃত্ব, রাকসুর ভিপি এবং দীর্ঘদিন বিএনপির মুখপাত্র—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে রুহুল কবির রিজভী।
রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে এসেছেন রুহুল কবির রিজভী। ছাত্রজীবনে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক পথচলা শুরু করা রিজভী পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলটির নানা সংকট ও আন্দোলনের সময়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি যখন রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দলটির নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রিজভী। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে থাকা এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করার সময়ে প্রায় প্রতিদিনই নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাকে দেখা যেত। দলীয় কর্মসূচি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নানা সংকটে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে দলের অবস্থান তুলে ধরতেন।
রুহুল কবির রিজভীর পৈতৃক নিবাস কুড়িগ্রাম জেলায়। উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি বামপন্থি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন। রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদন প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটিতে যোগ দেন রিজভী। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্ররাজনীতির এই পর্যায়েই তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন রিজভী। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
ছাত্ররাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন রুহুল কবির রিজভী। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দলটির রাজনৈতিক বক্তব্য জনসম্মুখে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকট, দলীয় কর্মসূচি ও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন রিজভী।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন রিজভী। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজনীতিতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকার ধারাবাহিকতায় ১৫ আগস্ট ২০২৬ বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয় তাকে।
এর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ২০ আগস্ট ২০২৬ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত হন রুহুল কবির রিজভী। এর মধ্য দিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।
বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি থেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, রাকসুর ভিপি, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি, বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য—রিজভীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
দীর্ঘ সময় বিএনপির কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় বক্তব্য তুলে ধরার কারণে দলের তৃণমূলের কাছেও তিনি পরিচিত মুখ। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার সামনে এখন দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা, কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির কার্যক্রম পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
রুহুল কবির রিজভীর এই নতুন দায়িত্ব তাই শুধু তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেরই নতুন অধ্যায় নয়; বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন