
দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা কাটছে না। একের পর এক কার্যদিবসে শেয়ারের দাম কমতে থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে লেনদেনের নিম্নগতি বাজারের প্রতি আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার (৩০ আগস্ট) লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে উভয় বাজারের মূল্যসূচকে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ডিএসইতে একাধিকবার বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। গত ২৫ আগস্ট সূচক কমার পাশাপাশি বাজারটির লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে। সেদিন মোট ৫০৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়, যা প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
পরের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচকে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা দেখা গেলেও লেনদেন আরও কমে ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকায় নেমে যায়। গত ১৬ মার্চের পর এটিই ছিল সর্বনিম্ন লেনদেন।
এর আগে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ কার্যদিবস পতনের মধ্যে ছিল শেয়ারবাজার। ওই সময়ে বিভিন্ন খাতের শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়। ভালো কিংবা দুর্বল—কোনো ধরনের কোম্পানিই বিক্রির চাপ থেকে পুরোপুরি রেহাই পায়নি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, বিক্রির প্রবণতা এবং বাজারে তারল্য সংকট বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে অর্থ না ঢেলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ফলে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যা ও চাপ বেড়ে যাচ্ছে, যা শেয়ারের দাম কমিয়ে দিচ্ছে।
রোববারের লেনদেনের শুরুতে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দর বাড়ায় প্রাথমিকভাবে ডিএসইর সূচকও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। একের পর এক প্রতিষ্ঠান দরপতনের তালিকায় চলে আসায় শেষ পর্যন্ত সূচকগুলো বড় পতন নিয়েই লেনদেন শেষ করে।
দিন শেষে ডিএসইতে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩০৯টি প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে এবং ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের দাম অপরিবর্তিত ছিল।
১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ভালো কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৬টির শেয়ার দর বেড়েছে। বিপরীতে ১৬৩টির দর কমেছে এবং ১১টি কোম্পানির শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া মাঝারি মানের কোম্পানির মধ্যে ১২টির দর বাড়লেও ৫৮টির দাম কমেছে। অপরিবর্তিত ছিল চারটির শেয়ার।
লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যেও বেশিরভাগের দর কমেছে। এই গ্রুপে ১১টি কোম্পানির শেয়ার দর বাড়লেও ৮৯টির কমেছে এবং ১৮টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে—একটির দাম বাড়ার বিপরীতে ২৯টির দর কমেছে এবং চারটির অপরিবর্তিত রয়েছে।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের দর কমায় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এক দিনে ৪১ পয়েন্ট হারিয়েছে। দিন শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬১৪ পয়েন্টে। একইভাবে ডিএসই-৩০ সূচক ১২ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১২২ পয়েন্টে নেমেছে। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসই শরিয়াহ কমেছে চার পয়েন্ট, অবস্থান করছে ১ হাজার ১২৮ পয়েন্টে।
সূচকের বড় পতন হলেও আগের দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। রোববার ডিএসইতে মোট ৫১৮ কোটি ৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৫১ কোটি ২ লাখ টাকা।
দিনের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে সায়হাম টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এরপর রয়েছে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, যার ২১ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সায়হাম কটনের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, লাভেলো আইসক্রিম, বেক্সিমকো, মালেক স্পিনিং, এমএল ডাইং ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও দিনটি ছিল নেতিবাচক। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪২টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১১২টির দর কমেছে এবং ২০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
দরপতনের ফলে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৭৫ পয়েন্ট কমেছে। দিনটিতে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে মোট ১১ কোটি ১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে সেখানে লেনদেন হয়েছিল ২১ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
সার্বিকভাবে, দুই শেয়ারবাজারের চিত্রে এখনো বিক্রির চাপই বেশি। সূচকের ধারাবাহিক পতন এবং তুলনামূলক কম লেনদেন বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট কাটেনি—এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন