ঢাকার রাস্তায় কালো ধোঁয়া এখন আর আকস্মিক কোনো দৃশ্য নয়; বরং নগরজীবনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। পুরোনো কোনো বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে আছে, ইঞ্জিন চালু হতেই পেছন থেকে বেরিয়ে আসছে ঘন কালো ধোঁয়া। পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষ মুখ ঢেকে ফেলছেন। রিকশাচালক কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেল আরোহী দ্রুত ধোঁয়ার মেঘ পেরিয়ে যেতে চাইছেন।
কয়েক মুহূর্ত পর ধোঁয়া চোখের আড়ালে চলে যায়। কিন্তু দূষণের ক্ষতিকর কণাগুলো বাতাসে থেকে যায়।
এই দৃশ্যের সঙ্গে আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে প্রশ্নটিই যেন অস্বাভাবিক শোনায়—কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন বন্ধ হবে কবে?
প্রশ্নটি নতুন নয়। তবে এর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ ঢাকার বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে রাজধানীতে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ৯১৫টি মামলা করা হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে মতিঝিলে ৩৫৪টি, ওয়ারীতে ১৭২টি, তেজগাঁওয়ে ১৩১টি, উত্তরা ১২৮টি, গুলশানে ৫৬টি, মিরপুরে ৩৬টি, রমনায় ৩৪টি এবং লালবাগে চারটি মামলা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। মামলা হওয়া তৎপরতার একটি প্রমাণ। কিন্তু এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—
এত মামলা হওয়ার পরও যদি ঢাকার সড়কে কালো ধোঁয়া দৃশ্যমান থাকে, তাহলে আমরা কি সমস্যার সমাধান করছি, নাকি সমস্যাটিকে কেবল জরিমানাযোগ্য অপরাধে পরিণত করছি?
জুলাইয়ে ৯১৫টি মামলা হয়েছে—এটি পুলিশের তৎপরতার প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু আগামী বছরও যদি একই ধরনের অভিযান ও একই মাত্রার মামলা করতে হয়, তাহলে সেটি সাফল্যের বদলে ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
কারণ লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু মামলা বাড়ানো নয়; এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহন পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে রাস্তায় চলতেই না পারে।
একটি গাড়ি যখন কালো ধোঁয়া ছাড়ে, তখন চালককে জরিমানা করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু গাড়িটি কেন অতিরিক্ত ধোঁয়া ছাড়ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হবে ইঞ্জিনের অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানির মান, যন্ত্রাংশ, ফিটনেস সনদ এবং যানবাহন পরিদর্শনব্যবস্থার দিকে।
অর্থাৎ কালো ধোঁয়া একটি দৃশ্যমান সমস্যা হলেও এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রশ্ন।
বাংলাদেশে মোটরযানের সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (BRTA) প্রকাশিত পরিসংখ্যানেও বিপুল সংখ্যক নিবন্ধিত মোটরযানের তথ্য পাওয়া যায়।
যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পরিদর্শনব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। শুধু রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে মামলা করলে সমস্যার মূল কারণ দূর হয় না।
বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণের সঙ্গে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু, প্রায় ২৫০ কোটি দিন অসুস্থতা এবং আনুমানিক GDP-এর ৮.৩ শতাংশের সমপরিমাণ স্বাস্থ্যব্যয়ের সম্পর্ক ছিল।
তাই কালো ধোঁয়া বন্ধের উদ্যোগকে শুধু নগরের সৌন্দর্য বা পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য শুধু যানবাহন দায়ী নয়। নির্মাণকাজ, রাস্তার ধুলা, শিল্পকারখানা, বর্জ্য পোড়ানো এবং অন্যান্য উৎসও দূষণে ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুদূষণকে বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কিন্তু একটি উৎসের দায় অন্য উৎসকে ছাড় দেওয়ার কারণ হতে পারে না।
যানবাহনের ক্ষেত্রে দ্রুত ফল পাওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে। একটি গাড়ি রাস্তায় নামার আগে তার নির্গমনমান পরীক্ষা করা যায়। চলাচলের সময় মোবাইল ইউনিটের মাধ্যমেও পরীক্ষা করা সম্ভব। একই গাড়ি বারবার নির্গমন পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তার ফিটনেস বা চলাচলের অনুমতির বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এই ধরনের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Clean Air Project-এর আওতায় পাঁচটি নতুন Vehicle Inspection Center নির্মাণ, দুটি অকার্যকর কেন্দ্র উন্নয়ন এবং ২০টি মোবাইল যানবাহন নির্গমন পরীক্ষার ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুরোনো দূষণকারী ডিজেল বাসের পরিবর্তে ৪০০টি শূন্য-নির্গমন বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা।
এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রকল্প ঘোষণা করলেই কাজ শেষ হয় না। কতগুলো পরিদর্শনকেন্দ্র তৈরি হলো, কত যানবাহন পরীক্ষা হলো, কতগুলো পরীক্ষায় ব্যর্থ হলো এবং কত গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এখানে বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ডিএমপি এবং সংশ্লিষ্ট নগর কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সংস্থা যদি বলে গাড়ির ফিটনেস তার দায়িত্ব, অন্য সংস্থা যদি বলে নির্গমন পরিবেশ অধিদপ্তরের বিষয়, আর পুলিশ যদি শুধু রাস্তায় আইন প্রয়োগ করে—তাহলে নাগরিকের কাছে সমস্যাটির কোনো সমাধান আসে না।
নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র একটিই ব্যবস্থা। তাই দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত সমন্বিতভাবেই পালন করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প নথিতে BRTA-এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে যানবাহন পরিদর্শন কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং পুরোনো যানবাহনের scrappage ও retrofitting-সংক্রান্ত নীতিমালা ও প্রক্রিয়া উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন করা গেলে কালো ধোঁয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেবল রাস্তার অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; যানবাহন রাস্তায় নামার আগের পর্যায়েও নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে।
পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু ‘পুরোনো গাড়ি বন্ধ’ বললেই সমস্যার সমাধান হবে না।
পরিবহন খাতের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই পুরোনো যানবাহন প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সহজ অর্থায়ন, ঋণ, উপযুক্ত প্রণোদনা এবং বাস্তবসম্মত স্ক্র্যাপেজ নীতি প্রয়োজন।
BRTA-এর আইনগত তথ্যভান্ডারেও মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা ২০২৬ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ পুরোনো যানবাহন ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখন নীতিগত কাঠামোর মধ্যেও এসেছে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন।
শুধু চালককে জরিমানা করে মালিক বা পরিবহন প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্ত রাখলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না।
একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের একাধিক গাড়ি যদি নিয়মিত অতিরিক্ত ধোঁয়া ছাড়ে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা ও দায়বদ্ধতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
চালক আইন প্রয়োগের সরাসরি মুখোমুখি হন। কিন্তু গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও নিয়মিত সার্ভিসিংয়ের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে মালিক বা প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে।
তাই দায়বদ্ধতাও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
আমাদের চিন্তাতেও পরিবর্তন দরকার।
আজ ৯১৫টি মামলা হয়েছে—এটি একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু এটি একা পরিবেশগত সাফল্য প্রমাণ করে না।
সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে—কালো ধোঁয়া কতটা কমেছে।
যদি প্রতি বছর একই ধরনের শত শত বা হাজার হাজার মামলা করতে হয়, অথচ একই গাড়ি বা একই ধরনের গাড়ি আবারও রাস্তায় কালো ধোঁয়া ছাড়ে, তাহলে বুঝতে হবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধব্যবস্থায়ও ঘাটতি রয়েছে।
রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে অতিরিক্ত দূষণকারী গাড়ি শনাক্ত হবে, মেরামত বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি পাবে না এবং বারবার আইন ভাঙলে কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হবে।
ঢাকার বায়ুর মানকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকারে আনতে হবে। পরিবহন পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন, বাজেট এবং অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই বায়ুদূষণের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন বাস নামানোর আগে তার নির্গমনমান নিশ্চিত করতে হবে। পুরোনো বাস শুধু রং করে নতুন দেখানোর পরিবর্তে ইঞ্জিন ও নির্গমনব্যবস্থাও পরীক্ষা করতে হবে।
একই সঙ্গে গণপরিবহন উন্নত করতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর কম নির্ভর করেন।
কারণ পরিষ্কার বাতাসের জন্য শুধু দূষণকারী গাড়ি বন্ধ করলেই হবে না; নাগরিককে কার্যকর, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প পরিবহনও দিতে হবে।
নাগরিককে শুধু ‘অভিযান চলছে’ বলে সন্তুষ্ট রাখার সময় শেষ।
অভিযান চলবে, মামলা হবে—এগুলো প্রয়োজনীয় আইন প্রয়োগের অংশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণ জানতে চাইবে, ঢাকার বাতাস কি আগের চেয়ে পরিষ্কার হয়েছে?
জুলাইয়ে ৯১৫টি মামলা হয়েছে—যদি এই তথ্য সঠিক হয়, তাহলে এটি পুলিশের তৎপরতার একটি পরিমাপ। কিন্তু আগামী বছর একই সংখ্যক মামলা করতে হলে সেটিকে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি বলা যাবে না।
লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কালো ধোঁয়া ছাড়ার মতো যানবাহন রাস্তায় নামার আগেই শনাক্ত হবে।
একটি শহর কত বড়, কত উঁচু ভবন তার আছে, কত কিলোমিটার উড়ালসড়ক আছে—এসব উন্নয়নের দৃশ্যমান চিহ্ন। কিন্তু একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো সেখানে মানুষ কতটা নিরাপদে শ্বাস নিতে পারে।
তাই ঢাকার জন্য এখন প্রয়োজন আরেকটি বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতি।
পুলিশ মামলা করবে, BRTA যানবাহনের ফিটনেস ও নির্গমন পরীক্ষা করবে, পরিবেশ অধিদপ্তর দূষণের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করবে, পরিবহন মালিকরা রক্ষণাবেক্ষণের দায় নেবে এবং সরকার পুরোনো যানবাহন প্রতিস্থাপনের বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করবে।
সবকিছু একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
নইলে আজ ৯১৫টি মামলা হবে, কাল আরও মামলা হবে—কিন্তু কালো ধোঁয়া থেকে যাবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক ঢাকা, যেখানে কালো ধোঁয়া দেখলে মানুষ বিস্মিত হবে; কারণ সেটি হবে ব্যতিক্রম, প্রতিদিনের দৃশ্য নয়।
রাষ্ট্রের সাফল্য তখনই প্রমাণিত হবে, যখন নাগরিককে আর জিজ্ঞেস করতে হবে না—‘কালো ধোঁয়া বন্ধ হবে কবে?’
মন্তব্য করুন