সাবহেডলাইন: গ্যাসের ঘাটতি শুধু জ্বালানি সংকট নয়—এটি শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিনিয়োগ ও নাগরিক জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে; তাই দুই বছরের সময়সীমাকে অপেক্ষা নয়, স্থায়ী সমাধানের রোডম্যাপে রূপ দিতে হবে।
রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় ভোরে চুলা জ্বালাতে গিয়ে গৃহস্থ বুঝে যান—আজও হয়তো অপেক্ষা করতে হবে। কোথাও চুলার আগুন মিটমিট করে, কোথাও একেবারেই জ্বলে না। আবার কোথাও সিএনজি স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি, শিল্পকারখানায় কমে যায় উৎপাদন, আর পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হয়। ফলে গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এটি নাগরিক জীবন, শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশে চলমান গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা এবং এটি পুরোপুরি নিরসনে কমপক্ষে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক কিছু সমস্যা দূর হলেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকবে।
সরকার ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে, একই সঙ্গে এলএনজি আমদানি এবং স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের কাছে দুই বছর হয়তো একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা। কিন্তু যে পরিবারের চুলা আজ জ্বলছে না, যে কারখানা আজ অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে কিংবা যে সিএনজি চালক প্রতিদিন দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন—তাঁদের কাছে দুই বছর অত্যন্ত দীর্ঘ সময়।
গ্যাস সংকটের সাম্প্রতিক চিত্র দেখলে বোঝা যায়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো বেশ ভঙ্গুর। জুলাইয়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ফলে মোট সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
পরে টার্মিনালের কার্যক্রম আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলেই যদি জাতীয় পর্যায়ে এত বড় ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল?
এটি শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিও এখানে স্পষ্ট।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সার কারখানা, পরিবহন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। বিপরীতে অর্থনীতি ও শিল্পায়নের সঙ্গে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা।
ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান পূরণ করতে বাংলাদেশকে আমদানি করা এলএনজির ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু এলএনজি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এর মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায় শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। এলএনজি প্রয়োজন, কিন্তু এটিকে একমাত্র নির্ভরতার জায়গায় নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
যদি সত্যিই গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটাতে দুই বছর সময় লাগে, তাহলে এই দুই বছরকে নিছক অপেক্ষার সময় হিসেবে দেখা যাবে না। বরং এটিকে নিতে হবে জ্বালানি খাত সংস্কারের সময়সীমা হিসেবে।
এই সময়ে দ্রুত নতুন গ্যাসকূপ খনন, পুরোনো কূপের উৎপাদন বাড়ানো, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা, স্থলভাগে অনুসন্ধান জোরদার এবং সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
দেশের স্থলভাগে বিপুল গ্যাসের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও সম্ভাব্য মজুত এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস এক বিষয় নয়। তাই বৈজ্ঞানিক জরিপ, পরীক্ষামূলক কূপ খনন এবং বাণিজ্যিক মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হবে।
দেশীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আধুনিক রিগ, উন্নত ভূকম্পন জরিপ প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ছাড়া বড় পরিসরে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন।
শুধু নতুন কূপ খনন করলেই হবে না। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ওয়ার্কওভার ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে।
কারণ নতুন ক্ষেত্র থেকে যতটুকু উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় তার বড় অংশ আবার হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনুসন্ধান ও উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এ খাতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে হলে চুক্তির কাঠামো হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অনুসন্ধান চুক্তির শর্ত, ব্যয়, রাজস্ব ভাগাভাগি ও জবাবদিহির বিষয়গুলো পরিষ্কার থাকা জরুরি।
গ্যাস সংকটের সমাধান শুধু সরবরাহ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ব্যবহারের দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
পুরোনো পাইপলাইন, লিকেজ, সিস্টেম লস, অদক্ষ শিল্পযন্ত্র এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার—সবকিছুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে যদি আরও বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়, তাহলে সেটিও কার্যত নতুন গ্যাসের উৎস তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প খাতেও গ্যাস বরাদ্দের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। যেসব খাতে গ্যাস ব্যবহার করে বেশি কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও উৎপাদন তৈরি হয়, তাদের জন্য একটি স্বচ্ছ অগ্রাধিকার কাঠামো প্রয়োজন।
গ্যাসের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোও জরুরি। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় রুফটপ সোলার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কারণ একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে একাধিক উৎস থাকে এবং কোনো একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে না।
সরকার যদি বলে গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটাতে দুই বছর সময় লাগবে, তাহলে সেই দুই বছরের কর্মপরিকল্পনাও জনগণের সামনে থাকা উচিত।
কোন সময়ে কতটি কূপ খনন হবে, ভোলার গ্যাস কখন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, কত এলএনজি আমদানি করা হবে, কোথায় নতুন অনুসন্ধান হবে, পাইপলাইন ও অবকাঠামো কীভাবে উন্নত করা হবে—এসব বিষয়ে একটি পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
কারণ মানুষ শুধু আশ্বাস চায় না; মানুষ নিশ্চিত হতে চায় যে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি সত্যিই বদলাবে।
একজন গৃহিণী জানতে চান, কখন নিয়মিত চুলায় আগুন থাকবে। একজন শিল্পমালিক জানতে চান, তাঁর কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় কবে চলবে। একজন সিএনজি চালক জানতে চান, প্রতিদিন কত ঘণ্টা তাঁকে লাইনে দাঁড়াতে হবে। একজন বিনিয়োগকারী জানতে চান, বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছর নির্ভরযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যাবে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিতে পারলে জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংকটেও পরিণত হতে পারে।
তাই ‘আরও দুই বছর’ কথাটিকে কেবল অপেক্ষার ঘোষণা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে হতে হবে স্থায়ী সমাধানের সময়সীমা।
দুই বছর পর যেন আবার প্রশ্ন না ওঠে—‘গ্যাস সংকট কবে যাবে?’ বরং তখন যেন দেখা যায়, দেশীয় অনুসন্ধান বেড়েছে, নতুন গ্যাস উৎপাদনে এসেছে, এলএনজি আমদানি আরও পরিকল্পিত হয়েছে, পাইপলাইন ও অবকাঠামো শক্তিশালী হয়েছে, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বেড়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশও সম্প্রসারিত হয়েছে।
গ্যাস মাটির নিচে থাকা একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা হলো মানুষের তৈরি একটি ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে মাটির নিচে সম্পদ থাকলেও মানুষের চুলায় আগুন জ্বলে না, শিল্পের চাকা ঘোরে না এবং অর্থনীতির গতি বাধাগ্রস্ত হয়।
সুতরাং গ্যাস সংকট কবে পুরোপুরি যাবে—এর সুনির্দিষ্ট উত্তর হয়তো আজই দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সংকট থেকে বের হওয়ার পথ আজই নির্ধারণ করা সম্ভব।
সেই পথের ভিত্তি হতে হবে দেশীয় অনুসন্ধান, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, দক্ষ ব্যবহার, আধুনিক অবকাঠামো, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
দুই বছর পর গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়েছে কি না, সেটি শুধু চুলার আগুন দিয়ে মাপা যাবে না। মাপতে হবে শিল্পের উৎপাদন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা, সিএনজি স্টেশনের সারি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের জীবনে ফিরে আসা স্বস্তি দিয়ে।
গ্যাস সংকটের অবসান তাই কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার পরীক্ষা। এখন সিদ্ধান্ত—আরও দুই বছর সংকট গুনব, নাকি এই দুই বছরেই ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তুলব।
সূত্র: সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য, জ্বালানি খাতের প্রতিবেদন ও প্রকাশিত সংবাদভিত্তিক তথ্য
সম্পাদনা ও পরিবেশনা: Nexa Barta
মন্তব্য করুন