
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের কঠোর অভিযানে মাত্র দুই দিনের মধ্যে শত শত হোটেল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকরা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল থেকে নিউমার্কেটের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেকে নতুন করে থাকার জায়গা খুঁজছেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রশাসনের অভিযান অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় মারকুইজ স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকায় ২২১টি হোটেল এবং ৯টি রেস্তোরাঁ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি পাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
মূলত ফায়ার লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা অডিট, পুলিশের অনুমোদন, ফায়ার অ্যালার্ম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার নিরাপদ সিঁড়ি বা পথ না থাকাকে কেন্দ্র করে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পরই নিউমার্কেট থানার পুলিশ আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান শুরু করে। অভিযানে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও অংশ নেন এবং কয়েকটি হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে রাজ্য সরকার কলকাতার হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা পর্যালোচনার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়। কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস এবং সিইএসসির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি শহরের ৩ হাজার ৫০০টির বেশি হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে অভিযানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিউমার্কেট এলাকায়। বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তাদের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার পর্যটক নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় থাকেন। হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকেই থাকার জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
নতুন হোটেল খুঁজতে গিয়ে বাড়তি ভাড়ার মুখেও পড়ছেন পর্যটকরা। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু হোটেলে আগের তুলনায় ভাড়া দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। কোথাও কোথাও দালালের মাধ্যমে কক্ষ পাওয়া গেলেও তার জন্য অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।
পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে নিউমার্কেট এলাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবা খাতের বড় একটি ব্যবসা গড়ে উঠেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক হোটেল একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
কলকাতার গ্রিন লাইন পরিবহনের কর্মকর্তা শ্যামল ঘোষ বলেন, সীমান্ত এলাকা থেকে বাসগুলো যাত্রী নিয়ে কলকাতায় আসছে। কিন্তু পর্যাপ্ত হোটেল না থাকায় পর্যটকদের থাকার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আশপাশের যেসব হোটেলে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ভাড়াও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে তিনি জানান।
তবে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট—পর্যটকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি পূরণ না করা হোটেল ও রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ফলে একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর অভিযান, অন্যদিকে হঠাৎ আবাসন সংকটে বাংলাদেশি পর্যটকদের ভোগান্তি—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে আনা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন