
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাপানের পূর্বাঞ্চলে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৩৭ জন আহত হয়েছেন। রোববার (২৩ আগস্ট) স্থানীয় সময় ভোরে আঘাত হানা এ ভূমিকম্পে টোকিওসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। বেশির ভাগ আহত হয়েছেন ঘুম থেকে আতঙ্কে উঠে পড়া, পড়ে যাওয়া কিংবা আসবাবপত্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে। তবে ইয়োকোহামায় এক বয়স্ক নারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দক্ষিণ ইবারাকি প্রিফেকচারে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ৭০ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ কম্পন ছিল জাপানি স্কেলে ৫ দুর্বল। টোকিওর ২৩টি ওয়ার্ডসহ কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী ভূকম্পনও রেকর্ড করা হয়েছে।
ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে আঘাত হানে। কম্পনের পর মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। রাজধানী টোকিও এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুমন্ত মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। জেএমএ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পরবর্তী এক সপ্তাহে শক্তিশালী আফটারশকের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
কম্পনের প্রভাবে টোকিও ও নারিতা বিমানবন্দরের দিকে চলাচলকারী কয়েকটি এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচিতে বিলম্ব ঘটে। তবে শিনকানসেন বুলেট ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। টোকিওর কোতো ওয়ার্ডে একটি ভূগর্ভস্থ পানির পাইপ ফেটে গেলেও পরে তা মেরামত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর জাপানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো সুনামির সতর্কতা বা আশঙ্কা নেই। দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কোনো অস্বাভাবিকতার খবর পাওয়া যায়নি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির কার্যালয় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে। উদ্ধার ও জরুরি সংস্থাগুলো বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থার চূড়ান্ত ভূমিকম্প-তথ্যে ২৩ আগস্ট রাত ২টা ০ মিনিটে দক্ষিণ ইবারাকিতে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প এবং প্রায় ৭০ কিলোমিটার গভীরতার কথা বলা হয়েছে। এ কম্পনে ইবারাকি, চিবা, সাইতামা, টোকিও, কানাগাওয়া ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়।
এদিকে এপি জানিয়েছে, পাঁচটি প্রিফেকচারে অন্তত ৩৭ জন আহত হয়েছেন। বেশির ভাগ আঘাত গুরুতর নয়। ইয়োকোহামায় আহত বয়স্ক নারীর নিতম্বে গুরুতর আঘাত লাগে।
জাপানে এই ভূমিকম্পের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশটির দক্ষিণাঞ্চল মাত্র এক মাস আগে আরও বড় ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলেছে। গত মাসে কিউশু দ্বীপের কুমামোতো এলাকায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩৮ জন নিহত এবং ৩৬৪ জন আহত হন বলে এপি জানিয়েছে।
ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবে জাপান শক্তিশালী ভূমিকম্প মোকাবিলায় কঠোর নির্মাণনীতি, জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। সর্বশেষ কম্পনের পরও কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছে, বিশেষ করে সম্ভাব্য আফটারশকের বিষয়ে।
রোববারের ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে উদ্ধারকারী ও স্থানীয় প্রশাসনের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সাগাইং অঞ্চলে একটি বৌদ্ধ বিহারে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী রয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) মিয়াং টাউনশিপের সোয়েল লে ওহ গ্রামে এ হামলা চালানো হয় বলে স্থানীয় একটি বিরোধী সংগঠন ও প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
স্থানীয় বেসামরিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থা সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি অর্গানাইজেশন অব মিয়াং (সিডিএসওএম)-এর মুখপাত্র নুয়ে উ জানান, সকাল ৯টার দিকে একটি যুদ্ধবিমান বিহার প্রাঙ্গণে বোমা ফেলে। মিয়াং টাউনশিপটি মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালে থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় বিহারে এক সপ্তাহব্যাপী ধ্যান ও ধর্মীয় সাধনার আয়োজন চলছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বর্ষাবাস উপলক্ষে সেখানে ১০০ জনের বেশি মানুষ অবস্থান করছিলেন। একটি যুদ্ধবিমান প্রায় ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দুটি বোমা ফেলেছিল বলে এক বাসিন্দা এপিকে জানিয়েছেন। হামলায় তাঁর শাশুড়িও নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় বিরোধী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের বেশির ভাগই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বয়স্ক মানুষ। দ্য ইরাবদির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত ১৪ জনের মধ্যে ১১ জন পুরুষ ও তিনজন নারী। আহত ২০ জনের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রথম বোমা হামলার পর লোকজন আহতদের উদ্ধারে ছুটে গেলে বিমানটি আবারও হামলা চালায়। এতে উদ্ধার তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হয়। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট ধরন ও দ্বিতীয় বিস্ফোরণের বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হামলার পর বিহারটির বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রের প্রকাশিত ছবিতে বিহার প্রাঙ্গণে ধ্বংসস্তূপ এবং মানুষের ব্যক্তিগত সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
হামলার বিষয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। অতীতে সামরিক বাহিনী দাবি করে এসেছে, তারা কেবল বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সতর্কতা অবলম্বন করে।
তবে বিরোধী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক স্থাপনা ও জনবসতিতে বিমান হামলার অভিযোগ করে আসছে। বৌদ্ধ বিহার, স্কুল ও অন্যান্য জনসাধারণের স্থাপনা সংঘাতের মধ্যে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রথমে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
সাগাইং অঞ্চল বর্তমানে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মিয়াং টাউনশিপেও নিয়মিত সংঘর্ষ, বিমান হামলা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। দ্য ইরাবদির তথ্য অনুযায়ী, এই হামলার মাত্র দুই দিন আগে মিয়াং টাউনশিপেই আরেকটি বিমান হামলায় দুই স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক নিহত ও ১৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
মিয়ানমারে সামরিক বিমান হামলার ব্যাপকতা নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম) সম্প্রতি উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, দেশটিতে নির্বাচনকে সামনে রেখে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বিমান হামলার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল এবং পরবর্তী সময়েও হামলা অব্যাহত রয়েছে।
আইআইএমএমের প্রতিবেদনে বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলার অভিযোগ তুলে ধরা হলেও মিয়ানমারের সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই প্রতিবেদনকে একপেশে এবং ‘সন্ত্রাসীদের’ বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল বলে দাবি করেছে।
মিয়ানমারের প্রায় পাঁচ বছরের সংঘাতে সব পক্ষ মিলিয়ে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব ও গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশের ভেতরে বা সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
সোয়েল লে ওহ গ্রামের বৌদ্ধ বিহারে সর্বশেষ বিমান হামলা সেই দীর্ঘ সংঘাতের আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় সাধনায় অংশ নিতে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর হামলার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হামলার প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল এবং বেসামরিক মানুষের হতাহতের বিষয়ে সামরিক বাহিনীর অবস্থান কী—তা স্পষ্ট না হলেও ১৪ জনের মৃত্যু ও ২০ জনের আহত হওয়ার ঘটনা মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে আবারও সামনে এনেছে।
মন্তব্য করুন