গাজায় দাফনের জায়গাও ফুরিয়ে যাচ্ছে, কবরস্থানগুলোতে নেই নতুন কবরের স্থান - Nexa Barta
Nexa Barta
২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

গাজায় দাফনের জায়গাও ফুরিয়ে যাচ্ছে, কবরস্থানগুলোতে নেই নতুন কবরের স্থান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে গাজা উপত্যকায় শুধু বসতবাড়ি, হাসপাতাল ও অবকাঠামোই নয়, ধ্বংস হয়ে গেছে বহু কবরস্থানও। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতায় নিহতদের দাফনের জন্যও এখন পর্যাপ্ত জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক মরদেহকে বাগান, তাঁবু, স্কুল, হাসপাতাল ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রের মতো অস্থায়ী স্থানে দাফন করতে হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার ২২ আগস্টের এক প্রতিবেদনে গাজার এই ভয়াবহ মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। উপত্যকার প্রায় ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোই যুদ্ধ শুরুর আগেই ধারণক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এখন হাজার হাজার নিহতের মরদেহের কারণে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাবাকে দাফন করতে গিয়ে জায়গা পেলেন না ছেলে

আলজাজিরার প্রতিবেদনে গাজার জেইতুন এলাকার ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহির পরিবারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ৪০ বছর বয়সী বাবা মোহাম্মদ গত ১০ জুন ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। মরদেহ দাফনের জন্য ওমর জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখতে পান, কবরগুলো এত ঘন হয়ে গেছে যে নতুন করে দাফনের মতো জায়গা প্রায় নেই।

শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা আগে দাফন করা মরদেহের স্থান পুনর্বিন্যাস করে তাঁর বাবাকে কবর দেন। যুদ্ধের কারণে কবরের ওপর স্থায়ী ফলক বসানোর সামর্থ্যও অনেক পরিবারের নেই। কোথাও শুধু একটি পাথর কিংবা কাগজে মৃত ব্যক্তির নাম লিখে কবর চিহ্নিত করা হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপ থেকেই তৈরি হচ্ছে কবরের চিহ্ন

গাজায় কবরের সংকটের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে দাফনের উপকরণের তীব্র ঘাটতি। পাথর, নির্মাণসামগ্রী ও কবরের ফলক সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ধ্বংস হওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করা হচ্ছে।

গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় আগে কবরস্থানের জন্য ব্যবহৃত বা নির্ধারিত কিছু জায়গাও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নতুন কবরের জায়গা খুঁজে বের করা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাসপাতাল প্রাঙ্গণেও গণকবর

যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রগুলোর একটি দেখা গেছে হাসপাতালগুলোতে। গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের প্রাঙ্গণে তৈরি সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

যুদ্ধের সময় হামলা, নিরাপত্তাহীনতা ও জরুরি পরিস্থিতির কারণে অনেক মরদেহ দ্রুত কাছাকাছি কোনো নিরাপদ স্থানে দাফন করা হয়েছিল। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর পরিবারগুলো এখন এসব মরদেহ শনাক্ত করে স্থায়ী কবরস্থানে স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। তবে মরদেহ স্থানান্তরের কাজও সহজ নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন হচ্ছে।

খান ইউনিসে ৬০ কবর থেকে প্রায় ৬ হাজার

গাজার খান ইউনিস কবরস্থানের চিত্র পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে। কবরখোদক তাফেশ আবু হাতাব জানান, যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধের একপর্যায়ে তাঁকে দিনে প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করা এই ব্যক্তি বলেন, তাঁর কর্মজীবনে এমন ভয়াবহ রক্তপাতের সময় তিনি কখনো দেখেননি। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও অনেক। কখনো একটি ভবন, গাড়ি কিংবা তাঁবুর ওপর হামলায় পুরো একটি পরিবার নিহত হওয়ার পর তাদের মরদেহ একসঙ্গে কবর দিতে হয়েছে।

৭৩ হাজারের বেশি নিহত

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল এবং তাদের অনেককে দীর্ঘ সময় পর উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সম্প্রতি ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর গাজায় একাধিক বড় গণদাফনও হয়েছে। আগস্টের শুরুতে সাবরা এলাকায় ২০২৩ সালের হামলায় নিহত ১১২ জনের মরদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করার পর তাদের একসঙ্গে দাফন করা হয়। নিহতদের মধ্যে ৪০টি শিশুও ছিল।

এর কয়েক সপ্তাহ পর ২০ আগস্ট আরও অন্তত ৫০ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করে গাজা সিটিতে গণদাফন করা হয়। এসব মরদেহ যুদ্ধের শুরুর দিকে তাল আল-হাওয়া, জেইতুন, সাবরা, শেখ রাদওয়ান ও শাতি এলাকার হামলার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

নতুন কবরস্থানের প্রয়োজন

গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উপত্যকার বিদ্যমান কবরস্থানগুলোতে জায়গার সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে নতুন কবরস্থান স্থাপন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় অস্থায়ী স্থানে দাফন করা মরদেহগুলো শনাক্ত করে যথাযথ কবরস্থানে স্থানান্তর করতে হচ্ছে।

এই সংকট শুধু কবরের জায়গার সংকট নয়; এটি যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বিপর্যয়েরও প্রতিচ্ছবি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ স্থাপনা কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

ফলে গাজায় জীবিত মানুষের জন্য যেমন নিরাপদ আশ্রয় ও বসবাসের জায়গা সংকুচিত হয়েছে, তেমনি মৃতদের শেষ ঠিকানা—কবরস্থানগুলোর জায়গাও ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন কবর খোঁড়া এবং অস্থায়ী চিহ্ন দিয়ে আপনজনের শেষ ঠিকানা নির্ধারণ করা এখন বহু ফিলিস্তিনি পরিবারের নির্মম বাস্তবতা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পুরুষদের পর নারী এশিয়া কাপেও ট্রফি নিয়ে ‘ঝামেলা লাগার’ আশঙ্কা

আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ প্রাণহানি, মোটরসাইকেলেই ১৭৬

ঢাকায় ফিরেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

উল্লাপাড়ায় বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি নৌকাবাইচ, ঘাটে ১৪৪ ধারা

বৃষ্টির মধ্যেই ফেনীতে ১১ দলের লংমার্চের পথসভা শুরু

সালমান শাহকে স্মরণে বিএফডিসিতে বিনামূল্যে প্রদর্শিত হবে তিন সিনেমা

বরিশালের নতুন স্টেডিয়ামে ফিরছে জাতীয় ক্রিকেট, দায়িত্বে যাচ্ছেন কিউরেটর খোকন

কৃষিকাজ শুরুর আগে যে বিষয়গুলো জানা থাকা জরুরি

বিক্রির চাপে ফের বড় পতন শেয়ারবাজারে, কমেছে সূচক

সিনেমার শতকোটি আয়ের সুফল এবার মহারাষ্ট্রের অসহায় কৃষক পরিবারে

১০

শাকিব খানের ‘নিঃস্ব’-তে নাসির উদ্দিন খান? যা জানালেন প্রযোজক

১১

গুঞ্জনের অবসান, চেলসির জার্সিতে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ

১২

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের লড়াইয়ে পাঁচ দল, কার সামনে কেমন সমীকরণ

১৩

মেসির চার গোল দেখে উচ্ছ্বসিত কাসেমিরো, বললেন ‘এখনও বিশ্বের সেরা’

১৪

ঘরের মাঠে টেস্ট রানের নতুন রাজা জো রুট

১৫

ইশান কিষাণের চোটে অধিনায়ক হয়ে ইতিহাস বৈভব সূর্যবংশীর

১৬

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে সারজিসের ‘কমনসেন্স’ প্রশ্

১৭

সিটি নির্বাচন বিলম্বে বিএনপিকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ইসলামী আন্দোলনের

১৮

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বন্ধ, অনলাইনে টিকিট বিক্রি: ভোগান্তিতে দর্শনার্থীরা

১৯

২০২৭ হজে আরও ৩৮ এজেন্সির অনুমতি, মানতে হবে যেসব শর্ত

২০

গাজায় দাফনের জায়গাও ফুরিয়ে যাচ্ছে, কবরস্থানগুলোতে নেই নতুন কবরের স্থান

23 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
www.nexabarta.com