
কম সুদে সবুজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০টি তৈরি পোশাক কারখানাকে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ৫০০টি পোশাক কারখানা সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সিপিডি আয়োজিত পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য শক্তি ফোরামে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক খাতে রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০টি কারখানায় সরাসরি জরিপ চালানো হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের অনেক পোশাক কারখানা তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। অথচ শিল্পকারখানার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানায় মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ হচ্ছে। তবে রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এই খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে ঋণের সুদের হারকে। সিপিডির মতে, বাণিজ্যিক ঋণের সুদ ১০ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি হলে শিল্প রুফটপ সোলার প্রকল্পগুলো ব্যাংকের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ হিসেবে টিকে থাকা কঠিন। তাই কম সুদের গ্রিন ফাইন্যান্স এবং রেয়াতি ঋণের ব্যবস্থা জরুরি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পোশাক খাতের প্রায় ৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন বর্গমিটার ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এসব ছাদ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৫০০টি কারখানা কোনো অতিরিক্ত সহায়তা ছাড়াই রুফটপ সোলারে বিনিয়োগ করতে সক্ষম। আরও ১ হাজার ৩০০টি কারখানাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে তারাও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে যেতে পারবে। এছাড়া ৪০০টির বেশি কারখানার ক্ষেত্রে আরও বেশি নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, গ্রিন ফাইন্যান্স যদি সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে পাওয়া যায়, তাহলে রুফটপ সোলারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আরও বাড়বে। তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হলে একদিকে শিল্পকারখানার জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সহজ হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যও অর্জন করা সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতাদের চাহিদার পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এইচঅ্যান্ডএম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও এমঅ্যান্ডএসের মতো বড় ব্র্যান্ডগুলো পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠতে পারে।
অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী জানান, তাদের বিভিন্ন কারখানায় ইতোমধ্যে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। তবে এতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার মাত্র ৬ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ পোশাক কারখানা বহুতল ভবনে পরিচালিত হওয়ায় ছাদের জায়গা সীমিত। ফলে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করেও একটি কারখানার সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা বাস্তবে সম্ভব নয়।
সিপিডির আলোচনায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, পোশাক শিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মন্তব্য করুন