বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রচলিত অর্থবছরের সময়সীমায় বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জুলাই-জুনের পরিবর্তে এখন থেকে এপ্রিল-মার্চ সময়কালকে অর্থবছর হিসেবে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ পরিবর্তনের আগে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে একটি ট্রানজিশনাল বা অন্তর্বর্তী অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করে মাত্র নয় মাসে—জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত—অর্থবছর শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে এপ্রিল-মার্চ সময়কালেই সরকারের বাজেট, আয়-ব্যয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ আর্থিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
দীর্ঘ ৫৫ বছর পর অর্থবছরের সময়সীমায় এমন পরিবর্তন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। তবে এটি শুধু ক্যালেন্ডারের কয়েকটি মাস পরিবর্তনের বিষয় নয়। অর্থবছর রাষ্ট্রের আর্থিক কর্মকাণ্ডের মূল কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, করব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশ—সবকিছুর ওপরই এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব পড়বে।
একটি দেশের অর্থবছর মূলত সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার এক বছরের কাঠামো। এই সময়কে কেন্দ্র করেই সরকার নির্ধারণ করে কত টাকা রাজস্ব আদায় করবে, কোথায় কত ব্যয় করবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। ফলে অর্থবছরের সময় পরিবর্তন হলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি ব্যবস্থাকেই নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।
সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা, বাজেট ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার, রাজস্ব আদায়ের প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম, কর ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির বিভিন্ন সিস্টেমেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বড় বেসরকারি কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও তাদের হিসাব-নিকাশের সফটওয়্যার ও আর্থিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।
এ কারণে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু করার সিদ্ধান্তকে একটি বড় প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
অর্থবছর পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় যুক্তিগুলোর একটি হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির সঙ্গে বাংলাদেশের আবহাওয়ার সামঞ্জস্য তৈরি করা।
বাংলাদেশে প্রতি বছরই দেখা যায়, অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন তৎপরতা অর্থবছরের শেষ দিকে এসে হঠাৎ বেড়ে যায়। জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি শুরু হয়। অথচ এই সময়টিই বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমের শুরু। বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং মাটির আর্দ্রতার কারণে সড়ক, বাঁধ, কালভার্ট, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ফলে যে কাজ শুকনো মৌসুমে করার কথা, সেটি অনেক সময় বর্ষার মধ্যে করতে হয়। এতে কাজের গতি যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি প্রকল্পের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজ চলার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ে।
এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর কার্যকর হলে অর্থবছরের শুরুতেই এপ্রিল থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে। বছরের শেষ দিকে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় বাংলাদেশের তুলনামূলক শুষ্ক মৌসুম। ফলে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের বড় অংশই অবকাঠামো নির্মাণের জন্য তুলনামূলক অনুকূল সময় হিসেবে পাওয়া যাবে।
এটি বিশেষ করে সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সরকারি ভবন এবং অন্যান্য নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরে অর্থবছরের শেষ মাস জুনকে ঘিরে সরকারি ব্যয়ের চাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। অনেক প্রকল্পে অর্থবছরের শেষ দিকে ব্যয় দ্রুত বাড়ে। কখনো কখনো অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় দেখানোর তাগিদ তৈরি হয়।
এর ফলে জুন মাসে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে কাজের মানের চেয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল উত্তোলন বেশি গুরুত্ব পায়।
অর্থবছরের সময় এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তিত হলে মার্চ হবে অর্থবছরের শেষ মাস। মার্চ বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে পড়ে। ফলে প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য অর্থবছরের শেষ দিকটিও তুলনামূলকভাবে অনুকূল আবহাওয়া পাওয়া যাবে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—শুধু অর্থবছর পরিবর্তন করলেই প্রকল্প বাস্তবায়নের সব সমস্যা দূর হবে না।
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে শুধু অর্থবছরের সময়সূচি দায়ী নয়। প্রকল্পের অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ, নকশা, দরপত্র, ঠিকাদার নির্বাচন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, বাস্তবায়ন তদারকি এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা রয়েছে।
কোনো প্রকল্পের অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগলে অর্থবছর পরিবর্তন করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। একইভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে অথবা জমি অধিগ্রহণ শেষ না হলে এপ্রিল মাসে অর্থবছর শুরু হলেও প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।
তাই অর্থবছর পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরি, সময়মতো অর্থছাড়, দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও এপ্রিল-মার্চ সময়সীমার একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। গ্রামবাংলায় হালখাতা, ব্যবসায়িক হিসাব এবং খাজনা পরিশোধের সঙ্গে বাংলা নববর্ষের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তনের সঙ্গে কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার একটি নতুন কাঠামো গড়ে ওঠে। বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত বাংলা বছরের হিসাব কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ঔপনিবেশিক সময়েও ভারতীয় উপমহাদেশে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের প্রচলন ছিল। ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থনীতিবিদ জেমস উইলসন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে ভারত স্বাধীনতার পরও এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর বজায় রাখে।
অন্যদিকে পাকিস্তান পরবর্তীতে জুলাই-জুন সময়কাল গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও জুলাই-জুন অর্থবছর চালু রাখে। দীর্ঘ কয়েক দশক পর এখন আবার এপ্রিল-মার্চে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের সব দেশে একই সময়ে অর্থবছর শুরু হয় না। অনেক দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময়কালকে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছরের প্রচলন রয়েছে।
অন্যদিকে ভারত ও যুক্তরাজ্যে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর প্রচলিত। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানসহ কিছু দেশে জুলাই-জুন সময়কাল ব্যবহৃত হয়।
অর্থবছরের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো একক বৈশ্বিক নিয়ম নেই। একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজস্ব ব্যবস্থা, কৃষি মৌসুম, প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে অর্থবছরের সময়সীমা নির্ধারিত হয়।
নতুন অর্থবছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলোর একটি পড়তে পারে করব্যবস্থায়। বর্তমানে আয়কর, সরকারি হিসাব ও বাজেট ব্যবস্থার সঙ্গে জুলাই-জুন সময়সীমার সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থবছর এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তিত হলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা, কোম্পানি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নতুন সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সূচি, কর গণনার পদ্ধতি এবং করবর্ষের সংজ্ঞাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
বিশেষ করে বড় কোম্পানিগুলোকে তাদের অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার, আর্থিক প্রতিবেদন এবং অভ্যন্তরীণ হিসাবব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এর ফলে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত ব্যয় বাড়তে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি অর্থব্যবস্থা ও করব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর হলে এই পরিবর্তন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
অর্থবছর শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবের বিষয় নয়। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
জিডিপির হিসাব, মূল্যস্ফীতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি, সরকারি ঋণ, বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব অর্থবছরকে কেন্দ্র করে প্রস্তুত করা হয়।
অতএব নতুন অর্থবছর কার্যকর হলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও অর্থনৈতিক সূচকের তুলনা করার ক্ষেত্রেও একটি রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে ২০২৭-২৮ সালের নয় মাসের ট্রানজিশনাল অর্থবছরটি আগের ও পরের পূর্ণ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে আলাদা ব্যাখ্যার প্রয়োজন তৈরি করবে।
পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর। পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের একটি অন্তর্বর্তী অর্থবছর পরিচালনা করা হবে।
এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর শুরু হবে ১ এপ্রিল থেকে এবং শেষ হবে পরবর্তী বছরের ৩১ মার্চ।
এই নয় মাসের ট্রানজিশনাল সময়কে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। কারণ এ সময় সরকারি বাজেট, রাজস্ব আদায়, ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, হিসাবরক্ষণ এবং আর্থিক প্রতিবেদন—সবকিছুকে নতুন কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হবে।
এই সময়ের প্রস্তুতিতে কোনো ধরনের ঘাটতি থাকলে পরবর্তী পূর্ণ অর্থবছরে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অনেকে মনে করতে পারেন অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সরকারের ওপর পড়বে। বাস্তবে তা নয়।
বেসরকারি কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং করদাতাদেরও নতুন সময়সীমার সঙ্গে নিজেদের হিসাব-নিকাশ সামঞ্জস্য করতে হবে।
বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার পরিবর্তন, হিসাব বছরের পুনর্বিন্যাস, অডিট, কর পরিকল্পনা এবং আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে বাড়তি কাজ তৈরি হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি অর্থবছর ও কর ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও সরকারি আর্থিক নীতির মধ্যে আরও ভালো সামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও কৃষি, আবহাওয়া ও মৌসুমি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে অর্থবছরের সময়সূচি নির্ধারণে কৃষি মৌসুমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এপ্রিল-মার্চ সময়কাল বাংলা বছরের বৈশাখ-চৈত্রের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কৃষি উৎপাদন, বাজার, রাজস্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই সময়সীমার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
তবে কৃষি খাতে এর প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে কৃষি বাজেট, ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময়সূচি কীভাবে সাজানো হচ্ছে তার ওপর।
অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের আলোচনা বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০১০ সালেও জুলাই-জুনের পরিবর্তে অন্য সময়সীমায় অর্থবছর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল সরকারি সেবা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট।
তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নই হবে বড় পরীক্ষা।
অর্থবছর পরিবর্তনকে সফল করতে হলে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি হিসাব বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে একই সময়সূচির আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, প্রকল্প অনুমোদন, অর্থছাড় এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণেও পরিবর্তন আনতে হবে।
কোনো প্রকল্পের অর্থবছরের শুরুতেই অর্থছাড় নিশ্চিত না হলে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। আবার প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানোর সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে শুধু অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা করতে পারে। এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো দেশের আবহাওয়া ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির মধ্যে আরও ভালো সামঞ্জস্য তৈরি করা।
অর্থবছরের শেষ সময় যদি শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে পড়ে, তাহলে সড়ক, সেতু, বাঁধ, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে বর্ষাজনিত বাধা কমতে পারে। একই সঙ্গে জুনকেন্দ্রিক তড়িঘড়ি করে অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে অর্থবছর পরিবর্তন কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, দরপত্রের বিলম্ব, অদক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং দুর্বল জবাবদিহির মতো সমস্যাগুলো সমাধান না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
তাই এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরকে শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি হওয়া উচিত বৃহত্তর আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি অংশ।
দীর্ঘ ৫৫ বছর পর পরিবর্তনের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় লাগবে। নতুন কাঠামোর সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও করদাতাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, দক্ষ জনবল, সমন্বিত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং কঠোর জবাবদিহি।
সব প্রস্তুতি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা গেলে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন গতি আনতে পারে। আর যদি পরিবর্তন শুধু ক্যালেন্ডারে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
সুতরাং এখন মূল প্রশ্ন অর্থবছর বদলেছে কি না, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন—অর্থবছর বদলের সঙ্গে রাষ্ট্রের কাজের ধরন কতটা বদলাতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে।
মন্তব্য করুন