
২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক লড়াইয়ের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি দিনটি বাংলাদেশের জন্য সামনে আনছে ডেঙ্গুর পরিবর্তিত বাস্তবতা। একসময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও এর বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত নগরকেন্দ্রিক কৌশল এখন নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই নগরকেন্দ্রিক। বিশেষ করে ঢাকা ছিল সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র। ঘনবসতি, নির্মাণাধীন ভবন, জলাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এবং শহরের বাইরেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তারে বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে কিছু গ্রামীণ এলাকায় সংক্রমণের হার প্রধান শহরগুলোর সমান বা তার চেয়েও বেশি হওয়ার প্রবণতার কথা বলা হয়েছে। বছরের প্রথমার্ধে ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবণতাও এতে উঠে এসেছে।
অন্য একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার এবং জলবায়ুগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকির সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ডেঙ্গুকে শুধু ‘ঢাকার রোগ’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ ক্রমেই কমছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভুল হবে শহরের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে হুবহু গ্রামীণ এলাকায় প্রয়োগ করা। শহরে বহুতল ভবন, বেজমেন্ট, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও ঘনবসতি এডিস মশার গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হতে পারে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় পানির সংরক্ষণ পাত্র, বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা সামগ্রী, ছোট জলাধার ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই প্রতিটি এলাকার পরিবেশ ও মশার আচরণের ওপর ভিত্তি করে পৃথক নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোন ধরনের পাত্রে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা জরুরি।
ডেঙ্গুর শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মানুষের চলাচল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ জেলা, উপজেলা ও গ্রামে যাতায়াত করেন। কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে একই এলাকায় অন্য ব্যক্তির শরীরে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নির্মাণকাজের বিস্তার, প্লাস্টিকের পাত্রের ব্যবহার এবং বিভিন্ন স্থানে পানি সংরক্ষণের প্রবণতাও এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করছে।
তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার পরিবর্তন মশার জীবনচক্র এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে জলবায়ুগত পরিবর্তন ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে বলে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে উঠে এসেছে।
ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা নিধন নয়, স্থানীয় পরিবেশ ও জলবায়ুর পরিবর্তনকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
ডেঙ্গুর বিস্তার শহরের বাইরে চলে যাওয়ায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একসঙ্গে অনেক রোগী এলে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স, রোগী পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শহরের তুলনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে গুরুতর রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। দূরত্ব, পরিবহন সমস্যা এবং রোগ শনাক্তকরণে বিলম্বের কারণে জটিল রোগীর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এ কারণে উপজেলা পর্যায়েই ডেঙ্গুর প্রাথমিক শনাক্তকরণ, ঝুঁকির লক্ষণ চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত রোগীকে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
গ্রামীণ পর্যায়ে ডেঙ্গুর প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ণয়েও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক রোগী স্থানীয় চিকিৎসক, ফার্মেসি বা ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেন। ফলে সরকারি নজরদারি ব্যবস্থায় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা কম প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ অবস্থায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গু নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মশার ঘনত্ব এবং রোগীর তথ্যকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ফগিং বহুল ব্যবহৃত হলেও এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফগিং মূলত উড়ন্ত প্রাপ্তবয়স্ক মশার ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। কিন্তু প্রজননস্থল ধ্বংস করা না হলে নতুন মশা আবার জন্ম নিতে পারে।
তাই লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। অর্থাৎ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট (IVM)-কে গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে আকর্ষণভিত্তিক মশা ফাঁদ, জৈব লার্ভিসাইড, অটো-ডিসেমিনেশন প্রযুক্তি কিংবা উপযুক্ত ক্ষেত্রে ওলবাচিয়াভিত্তিক পদ্ধতির মতো নতুন প্রযুক্তি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ডেঙ্গুর গ্রামমুখী বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াতে পারে। একজন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আক্রান্ত হলে চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মদিবস হারানোর ক্ষতি হয়। গুরুতর রোগীকে জেলা বা বিভাগীয় শহরে নিতে হলে যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ে।
একই সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে গেলে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।
ডেঙ্গুর পরিবর্তিত ভূগোল বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতিতেও পরিবর্তনের দাবি করছে। এতদিন যেখানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক ছিল, এখন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও ডেঙ্গু নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত এডিস মশার নজরদারি, রোগীর তথ্য সংগ্রহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রমও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করলে হবে না। মশার ঘনত্ব বাড়ার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
বিশ্ব মশা দিবসে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—ডেঙ্গুর বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। এটি আর শুধু ঢাকা বা বড় শহরের রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় প্রতিরোধব্যবস্থাকেও শহরের সীমানা পেরিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।
ড. কবিরুল বাশার, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগ ও এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পরিবেশ, মশার ঘনত্ব, রোগীর তথ্য এবং জনগণের অংশগ্রহণকে একসঙ্গে বিবেচনা করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য করুন