বাগেরহাট প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের মোটরসাইকেলচালক মিরাজ শেখকে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছেন—এমন অভিযোগ করেছে তার পরিবার। গত ১০ এপ্রিল তাকে নিয়ে যাওয়ার পর চার মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি স্বজনদের। তবে কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, মিরাজকে আটক, হেফাজতে নেওয়া কিংবা গুম করার কোনো তথ্য বা প্রমাণ তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
মিরাজকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে সোমবার (২৪ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে তার পরিবার ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। সেখানে মিরাজের পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম অভিযোগ করেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাগেরহাটের জয়মনি ঠোড়ার কোচঘাট হারবাড়িয়া স্টেশন এলাকা থেকে সিভিল পোশাকে থাকা দুই ব্যক্তি, যাদের তারা কোস্টগার্ড সদস্য হিসেবে পরিচয় পেয়েছিলেন, মিরাজকে একটি নৌকায় তুলে হারবাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যান।
পরিবারের দাবি, হারবাড়িয়া স্টেশনে নেওয়ার ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে মোংলা দিক থেকে একটি কোস্টগার্ডের স্পিডবোট সেখানে আসে। ওই বোটে ৮ থেকে ১০ জন ইউনিফর্ম পরা সদস্য ছিলেন। পরে মিরাজকে ওই স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি স্থানীয় কয়েকজন মানুষ এবং মিরাজের স্ত্রীর সামনেই ঘটে বলেও দাবি পরিবারের।
লিজা আরও অভিযোগ করেন, মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন পর গভীর রাতে রবিন নামে একজন কোস্টগার্ড সদস্য ও মিজান মাঝি মিরাজের মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। এ ঘটনায় ২৩ এপ্রিল সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
পরিবারের দাবি, মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার পরের কয়েকদিন তারা কোস্টগার্ডের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে তাদের হেফাজতে থাকার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছিল। অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া গেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মিরাজের অবস্থান সম্পর্কে আর কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা ফাতেমা বলেন, স্বামীকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে তারা একাধিকবার মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কিন্তু এর পরও তার স্বামীর কোনো সন্ধান পাননি। পরিবারটির অভিযোগ, তাদের আন্দোলনের সময় লাঠিচার্জ করা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়।
মিরাজের মা তাসলিমা বেগমও ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। তিনি বলেন, ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার কোস্টগার্ডের কাছে যোগাযোগ করা হলেও পরবর্তীতে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে আটক করে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে পাঠানো উচিত। তার পরিবারের সদস্যদেরও আটকের কারণ ও অবস্থান সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন।
তিনি মিরাজ শেখকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনে বিচার করার আহ্বান জানান।
তবে পরিবারের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, কোস্টগার্ড মিরাজ শেখকে কখনো আটক, হেফাজতে গ্রহণ বা গুম করেনি।
তিনি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়েছে। অনুসন্ধানে মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ড কর্তৃক আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেওয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, মিরাজ সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনদস্যু চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীকে লজিস্টিক সহায়তা, মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বনদস্যু চক্রের মুক্তিপণ ও চাঁদার প্রায় ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে ওই চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে মিরাজের পরিবার বলছে, তারা কোনো অভিযোগ বা দাবির ভিত্তিতে নয়, বরং তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা চায়।
চার মাসের বেশি সময় ধরে মিরাজের কোনো সন্ধান না পাওয়ার ঘটনায় তার পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করায় বিষয়টি নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
মন্তব্য করুন