অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিলেন ডিসি
অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, জন্মস্থান বা পারিবারিক অবস্থান মানুষের হাতে থাকে না, কিন্তু অধ্যবসায়, দক্ষতা অর্জন এবং বড় লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে প্রত্যেকেই নিজের জীবন পরিবর্তন করতে পারে।
রোববার (২৮ জুন) চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন’ শীর্ষক ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের সমাপনী অনুষ্ঠান, সনদ প্রদান ও আর্থিক অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশ নানা জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি দেশ। দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করলেও সমাজের কিছু জনগোষ্ঠী এখনো উন্নয়নের মূল স্রোতে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হতে পারেনি। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থান এবং জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ গ্রহণই শেষ লক্ষ্য নয়; বরং এটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা। বৈশ্বিক কর্মবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে না পারলে উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়তে হয়। তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার, বড় স্বপ্ন দেখা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরলস পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
ড. বি. আর. আম্বেদকরের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রতিকূল পরিবেশ থেকেও অসংখ্য মানুষ সফলতার শিখরে পৌঁছেছেন। তাই ব্যর্থতাকে অজুহাত না বানিয়ে আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের দেওয়া প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার প্রকৃত মূল্য তখনই প্রমাণিত হবে, যখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারবেন। সরকার কেবল প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়াতে নয়, বাস্তব পরিবর্তন নিশ্চিত করতেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর বিষয়ে তিনি জানান, তাদের প্রায় ২৫০টি পরিবারের আবাসনের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
সরকারি অনুদান প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, অনুষ্ঠানে প্রায় ৯২ লাখ ৬০ হাজার টাকার সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এই অর্থ উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করা হলে ব্যক্তি যেমন লাভবান হবেন, তেমনি সরকারের উন্নয়ন উদ্যোগও সফল হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় চাহিদা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন এবং ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষদিকে জেলা প্রশাসক বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, মাদক মানুষের বিবেক ও বিচারক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তাই একটি মানবিক, নৈতিক ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সরকার এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা জেলে, হিজড়া, সন্ন্যাসী, হরিজন ও সেবক সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার অনুদান এবং সনদ প্রদান করা হয়। এছাড়া ২০৫টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে ৬৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী, দুস্থ ও মেধাবী ১৩৫ শিক্ষার্থীকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানে মোট ৯২ লাখ ৬০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।