সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে ভারত কে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের
সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। চুক্তির আওতায় নিজেদের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের বেসামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি দেশটির সামরিক বাহিনীও প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে।
ভারতের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পহেলগামে গত বছর সংঘটিত প্রাণঘাতী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকেই দুই প্রতিবেশী পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও বক্তব্যে বলেন, সিন্ধু নদীর পানির অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। প্রয়োজনে এ ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে সব ধরনের লড়াইয়ে যেতে পাকিস্তান প্রস্তুত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে ইসলামাবাদে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ২৭৬তম কোর কমান্ডার্স কনফারেন্সে সিন্ধু পানি ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সরকারের নীতিমালা এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের পানিসম্পদ রক্ষায় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) পূর্ববর্তী নির্দেশনার আলোকে সামগ্রিক কৌশলগত প্রস্তুতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পাকিস্তানের অবস্থান হলো, ভারত যদি সিন্ধু নদ ব্যবস্থার পানির প্রবাহ বন্ধ করে বা অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সেটিকে তারা যুদ্ধের সমতুল্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করবে। একই বৈঠকে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকে আফগানিস্তানের তালেবান-নিয়ন্ত্রিত এলাকা ব্যবহার করে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় ‘অপারেশন গজব-লিল-হক’-এর আওতায় গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির আলোচনায় কাশ্মীর ইস্যুতেও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রচলিত ও হাইব্রিড নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানের বক্তব্যের জবাবে ভারত জানায়, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের অব্যাহত ভূমিকার কারণেই সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ইসলামাবাদকে আগে স্থায়ীভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ থেকে সরে আসতে হবে। ভারতের দাবি, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় আগের মতো চুক্তি কার্যকর রাখা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি অনুযায়ী রাভি, সুতলেজ ও বিয়াস নদীর নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে এবং সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়। চুক্তির আওতায় ভারত বর্ষা মৌসুমে পাকিস্তানকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কেও আগাম তথ্য সরবরাহ করত। তবে চুক্তি স্থগিত থাকায় বর্তমানে সেই বাধ্যবাধকতা আর নেই। একই সঙ্গে ভারত ওই নদী অববাহিকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
পাকিস্তানের কৃষি উৎপাদনের বড় অংশই সিন্ধু নদ ব্যবস্থার পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দেশটির পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং তারবেলা ও মাংলা জলাধারের পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে ইসলামাবাদে উদ্বেগ বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান গত এক বছরে বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠানো, জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানো এবং আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করাসহ নানা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি