বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত হার মেনে বিদায় নিয়েছে ইংল্যান্ড। ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রধান কোচ থমাস টুখেলের কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা অনেকের মতে ইংল্যান্ডের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্যারেথ সাউথগেটের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইংল্যান্ডের দায়িত্ব নেন জার্মান কোচ থমাস টুখেল। নকআউট ম্যাচে কৌশলগত দক্ষতার জন্য পরিচিত এই কোচের কাছে ইংলিশ সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত দলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
সাউথগেটের সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডকে রক্ষণাত্মক ফুটবলের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও জয় ধরে রাখতে পারেনি দলটি। এবারও সেই স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, তবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। পার্থক্য হলো, এবার টুখেল নিজেই রক্ষণে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ করে দেন।
টুখেল জানতেন, এই টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে আর্জেন্টিনা। তারপরও গোলের লিড পাওয়ার পর দলকে আরও নিচে নামিয়ে এনে রক্ষণ শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুরুতে পরিকল্পনাটি কার্যকর মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনা পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। তখন ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন বাস্তব মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ কয়েক মিনিটে লিওনেল স্কালোনির দল দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে। ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরে। এরপর যোগ করা সময়ে লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে লাউতারো মার্টিনেজের হেডে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় মূলত দ্বিতীয়ার্ধে। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডের সামনে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আর্জেন্টিনা আক্রমণে উঠে আসায় তাদের রক্ষণেও ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পরিবর্তে টুখেল দলকে নিজেদের অর্ধেই সীমাবদ্ধ রাখেন।
বেঞ্চে থাকা বুকায়ো সাকা, ননি মাদুয়েকে কিংবা মার্কাস রাশফোর্ডের মতো গতিময় ফুটবলারদের নামিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে ইংল্যান্ড আরও রক্ষণাত্মক হয়ে ওঠে। ফলে পুরো ম্যাচের শেষ অংশে আক্রমণের বদলে প্রায় সব সময়ই তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় নিজেদের গোলপোস্ট রক্ষায়।
বিশ্বকাপের আগের ম্যাচগুলোতে ইংল্যান্ডের গতি, শারীরিক সক্ষমতা ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ছিল অন্যতম শক্তি। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই অস্ত্র ব্যবহার না করে টুখেল রক্ষণকেন্দ্রিক কৌশল বেছে নেন। এদিকে লিয়েন্দ্রো পারেদেস মাঠ ছাড়ার পর এবং নিকোলাস ওতামেন্দি বদলি হিসেবে নামায় আর্জেন্টিনার রক্ষণে যে গতির ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, সেটিও কাজে লাগাতে পারেনি ইংল্যান্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের কুলিং ব্রেকের পর টুখেল গর্ডনকে তুলে এজরি কনসাকে নামিয়ে তিন সেন্টার-ব্যাকের সঙ্গে পাঁচজনের রক্ষণ সাজান। পরে ড্যান বার্নকে নামিয়ে ৫-৪-১ ফরমেশনে চলে যান। এই সিদ্ধান্তে ইংল্যান্ড আরও পিছিয়ে যায় এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারায়।
মেক্সিকোর বিপক্ষে একই পরিকল্পনা সফল হলেও আর্জেন্টিনার মতো বল দখলে পারদর্শী দলের বিপক্ষে তা কার্যকর হয়নি। বরং বক্সের বাইরে লিওনেল মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজ পর্যাপ্ত জায়গা পেয়ে বারবার আক্রমণ গড়ে তোলেন। সমতাসূচক গোলের আগে এনজোর একটি শট পিকফোর্ড ফিরিয়ে দিলেও পরের প্রচেষ্টা আর ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
সমতায় ফেরার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আর্জেন্টিনার হাতে চলে যায়। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি শট পোস্টে লাগার পর শেষ পর্যন্ত মেসির দারুণ ক্রস থেকে লাউতারো মার্টিনেজ হেড করে জয়সূচক গোল করেন। সেই মুহূর্তের পর ইংল্যান্ডের আর ম্যাচে ফেরার মতো শক্তি বা পরিকল্পনা—কোনোটিই অবশিষ্ট ছিল না।
ফলস্বরূপ, টুখেলের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল ইংল্যান্ডকে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করেছে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, সেমিফাইনালের এই সিদ্ধান্তগুলো ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুলগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত হবে।